28.8 C
Chittagong
সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদচট্টগ্রামচট্টগ্রামের ভূমিধসের ঝুঁকিতে সাড়ে ৬ হাজার পরিবার

চট্টগ্রামের ভূমিধসের ঝুঁকিতে সাড়ে ৬ হাজার পরিবার

চট্টগ্রাম মহানগরীতে একটু ভারী বৃষ্টিপাত হলেই ২০০৭ সালের সেই বিভিষীকাময় স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। যে দিনটিতে পাহাড় ধসে নারী, শিশুসহ ১২৭ জন মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড় ধসে একই পরিবারের ৪ জনসহ ১০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় আবারও বুক ধরপর করছে চট্টগ্রাম শহরবাসীর।

তার মধ্যে চট্টগ্রাসহ দেশের তিন জেলায় তিনদিনের ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেয় আবহাওয়া অধিদফতর। আবহাওয়া বার্তায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামবে। সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বুধবার (১৯ জুন) থেকে আগামী ৭২ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

সেইসাথে পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও পাহাড় ধস বা ভূমি ধসের শঙ্কার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। এরপর মাইকিং আর সতর্ক বার্তা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন প্রশাসন।

এমনিতেই কিছুদিন আগে টানা বৃষ্টিপাত আর ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে শহরের ২৬টি পাহাড়। যেসব পাহাড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করছে প্রায় ৬ হাজার ৫শ ৫৮টি পরিবার।

এরই মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় (দুপুর ১২টা পর্যন্ত) চট্টগ্রামে ৩১ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মেঘলা আকাশ, আবহাওয়া অধিদফতরের বার্তা জানান দিচ্ছে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা। কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

আবহাওয়াবিদ মো. শাহীনুল ইসলামের ভাষ্য, সক্রিয় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে বুধবার (১৯ জুন) থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় ভারী (৪৪-৪৮ মিলিমিটার) থেকে অতি ভারী (৮৯ মিলিমিটারের উপরে) বর্ষণ হতে পারে। ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমি ধসের সম্ভাবনা রয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী পরিবারগুলোর কথা কেউ না ভাবলেও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বৃষ্টির পূর্ভাবাস পেলেই শহরবাসী নতুনভাবে জানতে পারে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা/বিভাগের মালিকানাধীন ১৬টি এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টিসহ মোট ২৬টি পাহাড় রুপান্তরিত হচ্ছে মরণফাঁদে।

তখন পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরে যাওয়ার নির্দেশণা আর আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে কিছুটা ব্যস্ত হয়ে পড়লেও জেলা প্রশাসন, চসিক, সিডিএ, ওয়াসা ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার পক্ষ থেকে স্থায়ী কোন সমাধানের উদ্দ্যেগ চোখে পড়ে না।

জানা যায়, চট্টগ্রামে বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলেই তৈরি হয় পাহাড় ধসের শঙ্কা। শুরু হয় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরানোর কাজ। পরিচালিত হয় উচ্ছেদ অভিযান। কিন্তু দুর্যোগ শেষ হলেই সবকিছু আবারও স্বাভাবিক হয়ে যায়। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতেই ফের শুরু হয় বসবাস।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন পাহাড়গুলোতে অবৈধভাবে দেয়া হয় বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে রীতিমতো বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন করেই দেয়া হয় বিদ্যুৎ।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিটি সভায় সেবা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কার্যত তা বাস্তবায়ন করা হয় না। ফলে দিনের পরদিন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে পাকাপোক্ত হয়ে বাস করেন অবৈধ বাসিন্দারা।

গেল বছরের শেষ দিকে নগরের বায়োজিদ লিংক রোড সংলগ্ন এলাকাসহ ওই সব পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে সতর্কীকরণ সাইন বোর্ড স্থাপন করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান।

তখন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেছিলেন, পাহাড় খেকোরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে উচ্ছেদ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

পাহাড়ে অবৈধ দখল ও কাটতে দেখলে তারা সরাসরি থানায়, পরিবেশ অধিদফতর ও জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন।

পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাহাড় কাটার দায়ে প্রায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে পরিবেশ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। পাহাড় কাটা প্রতিরোধে মনিটরিং ও নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।

এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পরও মাসখানেক যেতেই ফের পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে আবারো মরণফাঁদে রুপ দিয়েছে চিহ্নিত সেই ২৬ পাহাড়।

নগরীর বিভিন্ন পাহাড়ের পাদদেশে এখনো কয়েক হাজার পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করে আসছেন স্বীকার করে জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মো. ফখরুজ্জামান বলেন, ভারী বর্ষণজনিত কারণে পাহাড় ধসের সতর্কবার্তার পর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বলেন, এক হাজারের অধিক আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। সেখানে পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করেছি। আশ্রয় নেওয়া জনগণ যাতে দুর্ভোগে না পড়েন এর জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের লোকজন ঝুঁকিপূর্ণ বসুতিদের সরিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছেন।

তাছাড়া লালখান বাজার এলাকার বাটালি হিলে, বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা, কুসুমবাগ এলাকা, ফিরোজশাহ কলোনি, আমিন কলোনিসহ বিভিন্ন পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি এই ব্যাপারে সহযোগিতা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রত্যেককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানুষের জানমাল রক্ষায় আমরা সব সময় জিরো টলারেন্সে রয়েছি। আমরা চাই না কারও বিন্দু মাত্র ক্ষতি হোক।

উল্লেখ্য : ২০০৭ সালে এক দিনেই পাহাড় ধসে নারী, শিশুসহ মারা যান ১২৭ জন। ২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট লালখান বাজার মতিঝর্ণা এলাকায় পাহাড় ধসে মৃত্যু হয় চার পরিবারের ১২ জনের।

২০১১ সালের ১ জুলাই টাইগার পাস এলাকার বাটালি হিলের ঢালে পাহাড় ও প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে মারা যান ১৭ জন। ২০১২ সালের ২৬-২৭ জুনে মারা যান ২৪ জন। ২০১৩ সালে মতিঝর্ণায় দেয়াল ধসে মারা যান দুজন।

২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বায়েজিদ এলাকার আমিন কলোনিতে মারা যান তিনজন, একই বছর ২১ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ থানার মাঝিরঘোনা এলাকায় মা-মেয়ের মৃত্যু হয়।

২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুন রাঙামাটিসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণ হারান ১৫৮ জন। ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর নগরীর আকবরশাহ থানাধীন ফিরোজশাহ কলোনিতে মারা যান চারজন। ২০১৯ সালে কুসুমবাগ এলাকায় মৃত্যু হয় এক শিশুর। ২০২২ সালের ১৮ জুন মৃত্যু হয় চারজনের।