31.4 C
Chittagong
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকলং মার্চের চেয়ে বিদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ ৭১ জামায়াত নেতার

লং মার্চের চেয়ে বিদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ ৭১ জামায়াত নেতার

পূর্ববার্তা প্রতিবদেন

আট দফা দাবিতে গতকাল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১—দলীয় ঐক্যের রংপুর অভিমুখী লংমার্চ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় বক্তৃতা করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ সংসদ সদস্য বর্তমানে দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য সফরে রয়েছেন। সফরকারী দলে এমপিরা ছাড়াও জামায়াতের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং এমপিদের পরিবারের সদস্যসহ মোট ৭১ জন রয়েছেন। জামায়াতের দলীয় সূত্রে এ সফরকে ‘শিক্ষামূলক’ বলা হচ্ছে। তবে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের এতজন সংসদ সদস্যের একসঙ্গে এমন সফর ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে কৌতূহল, নানা আলোচনা।

জামায়াতে ইসলামী সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর জামায়াত এমপিদের সফর দলটির একাংশ এয়ার এশিয়ার ঢাকা—কুয়ালালামপুর রুটের একে—৭০ ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় যান। বাকি সদস্যরা পরের দিন অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। সফর দলে জামায়াতের ৩৪ এমপি, দুই কেন্দ্রীয় নেতা ও একজন লেখকসহ মোট ৭১ জন সদস্য রয়েছেন।

সফরটিকে জামায়াতের নেতারা শিক্ষামূলক ও ওমরা পালনের সফর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এ সফরে তারা বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বিরোধী দল, ইসলামিক রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক দলের চ্যালেঞ্জ, সংসদীয় আচার—আচরণ, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা, স্বচ্ছতা, সততা, জবাবদিহি ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জামায়াত সূত্রে জানা গেছে।

সফরের প্রথম তিনদিন দলটি মালয়েশিয়ায় ছিল। দেশটির সাবেক মন্ত্রী ও মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক দল ‘কেদিলান রাকাইয়াত’—এর আন্তর্জাতিক বিষয়ক ব্যুরো এবং ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইসলামিক স্টাডিজ (আইএআইএস) মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ড. মাসজলি মালিক গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক ফেসবুক পোস্টে জামায়াতের সংসদ সদস্যদের আতিথ্য দেয়ার কথা জানান। সেখানে তিনি এ সফরকে শিক্ষামূলক সফর বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ডিনারে অংশ নেন সফরকারীরা।

সফরে থাকা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশ—ই—শূরা সদস্য ও শেরপুর—১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা কোনো ফরমাল (আনুষ্ঠানিক) ট্যুর না। এটা ফ্যামিলি ট্যুর, গ্রুপ ট্যুর। তবে যেহেতু আমরা একই মতাদর্শের ব্যক্তিরা যাচ্ছি এবং সঙ্গে ফ্যামিলির লোকজনও আছে, এজন্য বিভিন্ন দেশে আমরা ওইসব সংশ্লিষ্ট দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রফেশনাল ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করছি।’

সংসদ সদস্যদের বিদেশ সফরের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ শাহান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এমপিদের বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে দেখতে হবে তারা কোন উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন। তারা যদি শিক্ষামূলক বা বিশেষ কোনো কারণে গিয়ে থাকেন তাহলে সেটা পরিষ্কার করতে সমস্যা থাকার কথা নয়। যদি সেটা স্পষ্ট না করা বা লুকানো হয় তাহলে সেখানে একটা প্রশ্ন উঠবে। কোনো সংসদ সদস্য বিদেশ যেতেই পারেন, কিন্তু সেখানে পলিসি বা পার্লামেন্টের বিষয়ে শিখতে গেছেন নাকি অন্য উদ্দেশ্যে গেছেন সেটা জানানো প্রয়োজন। এর আগে এমন সফরের উদাহরণ নেই।’

মালয়েশিয়া সফর শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর জামায়াতের সফরকারী দলটি সিঙ্গাপুরে পৌঁছায় এবং সেখানে তারা এক সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন। এছাড়া দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সিঙ্গাপুরে সফর শেষে তারা গতকাল দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ার আরেক দেশ ফিলিপাইনে পৌঁছেছেন। সেখানেও তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।

ফিলিপাইনের মধ্য দিয়ে তাদের দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়া সফর শেষে হবে। এর পরে শুরু হবে তাদের মধ্যপ্রাচ্য সফর। প্রথমে তারা বাহরাইন যাবেন এবং শেষে সৌদি আরবে ওমরা পালন করবেন। দুই দেশেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে সফরকারীদের। সৌদি আরবে ওমরা পালন শেষে ১ অক্টোবর দেশে ফিরবেন তারা।

সফরকারী জামায়াত এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন, এ সফর রাজনৈতিক নয়, বরং পারিবারিক প্রোগ্রাম। প্রথমে মালয়েশিয়ায় পৌঁছে তারা সেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু এটা প্রফেশনাল বা ফরমাল কোনো বিষয় ছিল না। এসব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পূর্ব পরিচিতির সূত্রে ও সাংগঠনিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে ইনফরমাল সাক্ষাৎ, ডিনার হয়েছে। পরে সিঙ্গাপুর সফরে সিম্পোজিয়াম ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে সিঙ্গাপুরের বর্তমান অবস্থায় আসার প্রেক্ষাপটসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ হয়।

জামায়াতে ইসলামীর সফরকারী দলে আছেন ঢাকা—৪ আসনের এমপি সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, ঢাকা—৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, ঢাকা—১৪—এর মীর আহমাদ বিন কাসেম, চট্টগ্রাম—১৬—এর মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, পিরোজপুর—১—এর মাসুদ সাঈদী, শেরপুর—১—এর মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, গাইবান্ধা—১—এর মো. মাজেদুর রহমান, গাইবান্ধা—৫—এর মো. আবদুল ওয়ারেস, রংপুর—৬ আসনের মো. নুরুল আমিন, খুলনা—২—এর এস কে জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলাল, খুলনা—৬—এর মো. আবুল কালাম আজাদ, বাগেরহাট—২—এর শেখ মঞ্জুরুল হক রাশেদ, চুয়াডাঙ্গা—১—এর মো. মাসুদ পারভেজ, নওগাঁ—২—এর মো. এনামুল হক, চুয়াডাঙ্গা—২—এর মো. রুহুল আমিন, গাজীপুর—৪—এর সালাহ উদ্দিন, কুড়িগ্রাম—৪—এর মো. মোস্তাফিজুর রহমান, যশোর—৫—এর গাজী এনামুল হক, নড়াইল—২—এর মো. আতাউর রহমান, নেত্রকোনা—৫—এর মাসুম মোস্তফা, মেহেরপুর—১—এর মো. তাজউদ্দিন খান, কুষ্টিয়া—৪—এর মো. আফজাল হোসাইন, গাইবান্ধা—২—এর মো. আবদুল করিম, ময়মনসিংহ—৬—এর মো. কামরুল হাসান, নীলফামারী—৪—এর আবদুল মুনতাকিম, নীলফামারী—২—এর আল ফারুক আবদুল লতিফ, নীলফামারী—৩—এর ওবায়দুল্লাহ সালাফি, জয়পুরহাট—১—এর মো. ফজলুর রহমান, নীলফামারী—১—এর মো. আবদুল সাত্তার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ—২—এর মো. মিজানুর রহমান, পাবনা—৩—এর মোহাম্মদ আলী আসগর, পাবনা—৪—এর মো. আবু তালেব মণ্ডল, রংপুর—১—এর মো. রায়হান শিরাজী এবং কুড়িগ্রাম—১—এর মো. আনোয়ারুল ইসলাম।

এছাড়া সংসদ সদস্য না হলেও সফর দলে আছে জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। আরো আছেন সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। এছাড়া জিয়াউল হক নামের একজন লেখকও সফরসঙ্গী হয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান মনে করেন, কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা বিদেশ সফরে গেলে সে বিষয়ে জনগণ জানতে চাইতে পারে। সুতরাং কোন ম্যান্ডেটে এমপিরা সফর করছেন সেটা পরিষ্কার করতে হবে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘জামায়াত এমপিদের এ সফরের বিষয়ে আমার জানা নেই। বিষয়টা সম্পর্কে মানুষকে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। আমরা এ উদ্দেশ্যে যাচ্ছি এবং অমুক জায়গায় যাচ্ছি। তাদের ম্যান্ডেটটা যেন পরিষ্কার হয়। যাতে কোনো গোপনীয়তা না থাকে। এটা যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত পর্যায়ের ভিজিট হয়, সেটা নিয়ে কোনো কথা নেই। কিন্তু যদি একটি বড় রাজনৈতিক দলের অনেকে সফর করেন, তাহলে সেটা জনপরিসরে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন আছে। যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে যারা জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন, তাদের যেকোনো গতিবিধি, যেকোনো আচরণের পাবলিকলি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা জনপরিসরে দেয়ার প্রয়োজন আছে। কারণ তিনি যা করছেন সেটা ব্যক্তি হিসেবে না, দল হিসেবে করছেন।’

দলের ৩৪ এমপির দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য সফর নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সফরে প্রায় ৩৪ জন এমপি গেছেন। তাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। সফরের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পার্লামেন্ট ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শন করা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন। তারা কয়েকটি দেশে সফর করবেন।’

জামায়াতসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু এ সফর নয়, ভবিষ্যতে ইউরোপ—আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দলটির সফর চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সূত্র—বণিকবার্তা