24.2 C
Chittagong
বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকভারতে ভোটার তালিকা থেকে মীর জাফর বংশধরের নাম বাদ ইতিহাসের প্রতিশোধ নাকি...

ভারতে ভোটার তালিকা থেকে মীর জাফর বংশধরের নাম বাদ ইতিহাসের প্রতিশোধ নাকি মুসলিম তকমা 

পূর্ববার্তা প্রতিবদেন

বংশ পরম্পরায় ভারতের নাগরিক হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বাংলার নবাব মীর জাফরের অনেক বংশধরের নামও। হাজার দুয়ারি প্রাসাদে বসবাস, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির সাক্ষাতকার দেয়া সত্ত্বেও নাম বাদ।

ভারতের নির্বাচন কমিশন পরিচালিত ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া নামের তালিকা দফায় দফায় প্রকাশিত হচ্ছে। মুর্শিদাবাদের লালবাগের ‘কেল্লা নিজামত’ এবং তার আশপাশের অঞ্চলের বাসিন্দা নবাব বংশের দেড়শোরও বেশি সদস্যের নাম ওই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে পরিবারের তরফে অভিযোগ করা হচ্ছে।

বাদ পড়েছে ‘ছোটে নবাব’ নামে পরিচিত সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জা এবং তার পুত্র সৈয়দ মুহাম্মদ ফাহিম আলি মির্জার নামও।

তাদের পরিবার জানাচ্ছে, প্রাথমিক ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে অনেককেই শুনানিতে ডাকা হয়েছিল এবং সেখানে তারা সব নথিপত্র জমাও দিয়েছিলেন। তবুও বৈধ ভোটারদের তালিকা থেকে তাদের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন, ১৯৪৭ সালে অনেক প্রলোভন সত্ত্বেও যে পরিবারের বেশিরভাগই পাকিস্তানে না গিয়ে ভারতে থেকে গিয়েছিলেন, এত বছর পরে কেন নতুন করে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে?তবে মীরজাফর পরিবারের একজন নামজাদা সদস্য পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। সেই ইস্কান্দার আলি মির্জা পাকিস্তানের চতুর্থ ও শেষ গভর্নর জেনারেল এবং প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার জন্মও লালবাগের কেল্লা নিজামতেই, যেখানে এখন থাকেন ছোটে নবাব সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জা এবং তার রাজনীতিবিদ পুত্র সৈয়দ ফাহিম আলি মির্জারা।ছোটে নবাব বলে পরিচিত সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জা বিবিসি বাংলাকে এর আগে বলেছিলেন, “আমাদের ফ্যামিলির তিন হাজারের মতো সদস্য আছেন। অনেকে এখানেই থাকেন, কেউ ইংল্যান্ড, আমেরিকা বা বাইরে চলে গেছেন। তবে তাদের সবার বাড়ি এখানে রয়েছে।”

তার পুত্র সৈয়দ মুহাম্মদ ফাহিম আলি মির্জা বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন যে, তাদের ‘কিলা নিজামত’ এবং তার আশপাশে যারা থাকে, তাদের ভোট কেন্দ্র লালবাগের নব আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে।

“ওই স্কুলের ১২১ নম্বর আর ১২২ নম্বর বুথেই আমাদের পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের ভোট। ওই বুথে মোট ভোটার ৮৫০—র কিছু বেশি। তার মধ্যে নবাব পরিবারের ভোটার প্রায় ৫৫০। এদের মধ্যে দেড়শো জনের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে,” জানাচ্ছিলেন মি. মির্জা।

মি. মির্জা মীর জাফরের ১৬তম উত্তরপুরুষ, আবার তিনি স্থানীয় পৌরসভা তৃণমূল কংগ্রেসের পৌর প্রতিনিধি।

তিনি বলছিলেন, “মুর্শিদাবাদ শহরে হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে অন্যান্য নবাবি স্থাপত্য সব আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি। অথচ ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নাম কেটে নাগরিকত্বই কেড়ে নেওয়া হল। আমার পূর্বপুরুষ সৈয়দ ওয়াসিফ আলি মির্জাকে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের পরিবার চিরকাল ভারতে থেকেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুর্শিদাবাদ তিনদিন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শেষে আমাদের পরিবারের হস্তক্ষেপেই খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।”

বাদ পড়া ভোটারদেরদের মধ্যে সৈয়দ মুহাম্মদ ফাহিম আলি মির্জা, তাঁর বাবা — ছোটে নবাব সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জা, স্ত্রী, জ্যাঠা সৈয়দ মুহাম্মদ আব্বাস আলি মির্জার দুই মেয়ে ও বড়ো ছেলে রয়েছেন।শুনানিতেও ডাক পড়েছিল নবাব বংশের সদস্যদের
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশের পরে নবাব বংশের সদস্যদের শুনানিতে ডাকা হয়েছিল।

ছোটে নবাব বলে পরিচিত সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জারও ডাক পড়েছিল শুনানিতে।

তিনি বলছেন, “যখন শুনানি হয়, সেই সময়ে আমি খুবই অসুস্থ ছিলাম। ছেলে বলেছিল যে বাবা আপনি কেন যাবেন, আমিই যাচ্ছি। ওকে আমি বলি, ইলেকশন কমিশন যখন ডেকেছেন, তারা সম্মানীয় সংস্থা, আমি নিজেই যাব। সেখানে গিয়ে আমার ছবি তোলা হয়, নথি জমা দিয়ে সই করলাম। একজন অফিসার তো বললেন, যে আপনি কেন এসেছেন! আপনি নবাব পরিবারের মানুষ, কেন হিয়ারিংয়ে আসলেন? আমি বলেছিলাম, না ভাই, আইন সবার জন্যই সমান।”

তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে পুত্র সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জার কাছে ‘ছোটে নবাব’ জানতে চান, “বেটা আমার কী হল?”

“সে বলে বাবা, আপনার নাম তালিকায় ওঠেনি! আশ্চর‌্যের ব্যাপার! আমরা নবাব পরিবার, গঙ্গায় ভেসে আসিনি তো। আমাদের বাপ দাদারা এই অঞ্চল শাসন করে গেছেন। আমাদের সঙ্গে এমনটা হল, এটা কি অন্যায় না?” প্রশ্ন সৈয়াদ মুহাম্মদ রেজা আলি মির্জার।

তিনি আরও বলছিলেন, “যদি ভোট দিতে না পারি, তাহলে এখানে থাকতে পারব না, আমাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমি তো এই মাটিতে জন্ম নিয়েছি, এখানেই মাটি নেব। শুধু আমার সঙ্গে না, পরিবারের অনেকের সঙ্গেই হয়েছে এই অন্যায়।”

কেন বাদ পড়ল নাম?
সৈয়দ মুহাম্মদ ফাহিম আলি মির্জা বলছিলেন, তারা বুঝতেই পারছেন না যে কেন তাদের পরিবারের এত সদস্যের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হলো।

তার কথায়, “এই প্রশ্নের জবাব তো নির্বাচন কমিশন দেবে। আমাদের কাছে এর উত্তর নেই। তবে একটা কথা জানিয়ে রাখি, এর আগে ভোটার তালিকায় আমার আর আমার বাবার নামের থেকে একটা করে শব্দ বাদ গিয়েছিল। ২০০২ সালে যে তালিকার ভিত্তিতে এবার এসআইআর হয়েছে, তাতে বাবার নাম ছিল ‘মহম্মদ রেজা আলি মির্জা’, সেখানে সৈয়দ ছিল না।”

“আবার আমার নাম ছিল সৈয়দ ফাহিম মির্জা, মুহাম্মদ ছিল না। কমিশনের নিয়ম মেনে পরে দুজনেই নাম সংশোধন করি। তবুও এবার এসআইআর —এ আমাদের নাম প্রথমে ‘বিবেচনাধীন’ ছিল আর এখন বাদ দিয়ে দেওয়া হলো।”

তিনি জানান, “নাম বাদ গেলে ট্রাইবুনালে আবেদনের পথ আছে, আমরা সেখানে আবেদন করবো। কিন্তু শুনানি হতে এত সময় লাগবে যে ততদিনে বিধানসভা ভোট পেরিয়ে যাবে— পরিবারের কেউই এ বছর ভোট দিতে পারবেন বলে মনে হয় না।” সূত্র বিবিসি