28.3 C
Chittagong
বুধবার, ২০ মে ২০২৬
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদজাতীয়চট্টগ্রাম শহরে সক্রিয় ২০০ কিশোর গ্যাং সর্বশেষ বলি কলেজ ছাত্র সাজিদ

চট্টগ্রাম শহরে সক্রিয় ২০০ কিশোর গ্যাং সর্বশেষ বলি কলেজ ছাত্র সাজিদ

পূর্ববার্তা প্রতিবদেন

চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় একের পর এক খুন মারামারিসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটে চলেছে। কিশোর গ্যাংয়ের আক্রমনের সর্বশেষ বলি মেধাবী কলেজ ছাত্র আশফাক কবির সাজিদ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক জরিপে দেখা গেছে, নগরীতে সক্রিয় প্রায় ২০০ কিশোর গ্যাং রয়েছে। গত ছয় বছরে সংঘটিত অন্তত ৫৪৮টি অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে ৬৪ জন ‘বড় ভাই’ বা প্রভাবশালীর পৃষ্ঠপোষকতার তথ্যও উঠে এসেছে।

কিশোর গ্যাংয়ের সর্বশেষ বলি রোববার ১২ এপ্রিল বিকালে এক্সেস রোড সংলগ্ন মৌসুমী আবাসিক এলাকায় (ডিসি রোড) আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই কিশোর গ্যাং মারামারি হয়। এক গ্রুপ আরেকটি গ্রুপকে দা কিরিচ ও ধামা নিয়ে ধাওয়া দেয়। এ সময় মারধরের হাত থেকে বাঁচতে আমিন—হাসান বিল্ডিংয়ের ৮ম তলায় উঠে পড়ে আশফাক কবির সাজিদকে (১৭)। ভবনটিতে দুইটি লিফটের অবকাঠামো থাকলেও একটি লিফট চালু রয়েছে। অপর লিফটটি ফাঁকা। আক্রমনকারী কিশোর গ্যাং সদস্যরা ছাদে মারধর করে লিপ্টের গর্তে ফেলে হত্যার করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশ খবর পেয়ে কলেজছাত্র সাজিদকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠান। সাজিদ নগরীর বিএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তার পিতার নাম আবুল হাশেম সিকদার। বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানা বদরখালী ইউনিয়নে। এই ঘটনায় নিহতের বাবা আবুল হাশেম সিকদার বাদী হয়ে মঙ্গলবার চকবাজার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, তুচ্ছ বিরোধ থেকেও প্রাণঘাতী সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। গত বছরের ১৬ মে জুমার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর কলেজছাত্র ওয়াহিদুল আলম সাব্বিরকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে সমবয়সী কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এর আগে ২০২৪ সালের ১ জুন বোয়ালখালীতে সামান্য কথা কাটাকাটির জেরে খুন হয় স্কুলছাত্র আরিফ হোসেন। তাকে হত্যা করে তারই বন্ধু ১৪ বছর বয়সি এক কিশোর। ২০১৮ সালে নগরীর কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনানও কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল আকবর শাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় গুরুতর আহত হন দন্তচিকিত্সক কোরবান আলী ও তার ছেলে আলী রেজা। মাথায় ইটের আঘাতে গুরুতর আহত কোরবান আলী আইসিইউতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, গণি বেকারি, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকা, চমেক হোস্টেল এলাকা, ওআর নিজাম রোড আবাসিক এলাকা, সিআরবি, খুলশি, ফয়’স লেক, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, হালিশহর, বন্দর ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তত্পরতা বাড়ে। তারা মোটরসাইকেল ও সাইকেলসহ পথচারীদের সর্বস্ব ছিনতাই, মাদক বিক্রির মতো সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।

কিশোর গ্যাং দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নেই। সম্প্রতি র্যাব কিশোর গ্যাং লিডার ইমতিয়াজ সুলতান ইকরামকে গ্রেফতার করেছে। সে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী এবং স্কুলছাত্রী তাসফিয়া হত্যা মামলার আসামি। ১১ মার্চ মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ ৪৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৯ জন কিশোর গ্যাং সদস্য রয়েছে। এর আগে আনোয়ারায় অভিযান চালিয়ে ‘সম্রাট গ্রুপ’—এর প্রধানসহ তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় ধস্তাধস্তিতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন।

এছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও ফেনী এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ছয়টি কিশোর গ্যাংয়ের ২৮ সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যাব। তারা সংঘবদ্ধ হয়ে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নারীদের উত্ত্যক্তসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিল।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে হামজারবাগ ও মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ‘এমবিএস (মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট)’ নামে একটি কিশোর গ্যাংয়ের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের বয়স ছিল ১৬ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে।

পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, কিশোর গ্যাংগুলোর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক পরিচয়ে ‘বড় ভাইদের’ পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় এসব কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এবং আইন প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নজরদারির অভাব, মাদকাসক্তি, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

সিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাং ও তাদের মদতদাতাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে চাঁদাবাজি, মাদক, জুয়া, কিশোর গ্যাং ও মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন নগর পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। তিনি বলেন, এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম—দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।

তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, বিচ্ছিন্ন অভিযান কিশোর গ্যাং দমনে স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না। সংগঠিত এই অপরাধচক্র নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল না নিলে পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।