বুড়িগঙ্গা তিরের লালবাগ কেল্লা থেকে বিলাসবহুল নৌকায় বিকেলে বন্যা প্লাবিত বিস্তৃর্ণ চরে বেড়াতে এসে মোহাম্মদপুরের প্রেমে পড়ে যান বাদশাহ আলমগীর শাহজাদা সুবাহ বাংলার শাসক মোহাম্মদ আজম। তিনিই তৈরি করে সাত গম্বুজ মসজিদ। বিশাল বাগান তৈরি করে নির্মিত সড়কের নাম দেন বাবর রোড. হুমায়ুন রোড, শাহজাহান রোড, নূরজাহান রোড, আওরঙ্গজেব রোড, শেরশাহসূরী রোড, খিলজি রোড, রাজিয়া সুলতানা রোড, তাজমহল রোড ইত্যাদি। বাগান ফুলের রাজ্যের সেই মোহাম্মদ পুর এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বিপদজ্জনক সন্ত্রাসী এলাকা হিসাবে চিহ্নিত।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে বর্তমানে প্রায় ৫০টি অপরাধী দল সক্রিয়, যার মধ্যে ১৭টি বড় দল। এসব দলের সদস্যরা মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। গত প্রায় ২০ মাসে এসব সংঘর্ষে অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ ইমনের পর আরও এক ব্যক্তি হত্যার শিকার হন মাদক ব্যবসার বিরোধে।
স্থানীয়দের মতে, চার দশকের বেশি সময় ধরে এলাকায় অপরাধের এই ধারা চলছে। সময়ের সঙ্গে অপরাধের ধরন বদলেছে, নতুন নতুন গ্রুপ তৈরি হয়েছে, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও পাল্টাপাল্টি হত্যার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘অ্যালেক্স ইমন’ নামে পরিচিত ইমন হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর। ১২ই এপ্রিল প্রকাশ্যে ধাওয়া করে কুপিয়ে হত্যার এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ জানায়, ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ ১৮টি মামলা ছিল, তবে কোনো মামলারই বিচার শেষ হয়নি।
এই ঘটনার সঙ্গে অনেকেই মিল খুঁজছেন ব্রাজিলের আলোচিত সিনেমা সিটি অফ গড—এর শেষ দৃশ্যের। সেখানে যেমন অপরাধী চক্রের সদস্যরা আইনের বাইরে থেকে সহিংসতার শিকার হয়, তেমনি মোহাম্মদপুরেও অপরাধীরা একে অন্যের হাতে নিহত হচ্ছে, বিচারহীনতার চক্র চলছেই।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরো—এর ‘সিটি অব গড’ বস্তির মতোই মোহাম্মদপুরেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও ইতিহাস, সামাজিক বৈষম্য ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কারণে এলাকা ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, মোহাম্মদপুর কি সত্যিই ঢাকার ‘সিটি অব গড’ হয়ে উঠছে, নাকি কার্যকর আইন প্রয়োগ ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে এখনো পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
মোহাম্মদপুরের ইতিহাস
একসময় ঢাকা শহরে সবচেয়ে রাজকীয় এলাকা ছিলো মোহাম্মদপুর। মোঘল বাদশাদের সাথে মোহাম্মদপুরের এক নিবিড় আত্মার সম্পর্ক ছিলো। যার ফলে পুরান ঢাকার পরে এই শহরে সবচেয়ে বেশী স্থাপনা গড়ে উঠেছিলো মোহাম্মদপুরে।
মোহাম্মদপুরের রাস্তঘাটের নাম অন্যান্য এলাকা থেকে ভিন্ন রকমের। এই এলাকায় মুঘল বাদশাহগণের নামে অসংখ্য রাস্তাঘাট তৈরী হয়েছে। বাদশাহ শাহজাহানের প্রাণরানী মমতজের নামে রয়েছে তাজমহল রোড। এছাড়াও রয়েছে হূমায়ুন রোড, বাবর রোড, আওরঙ্গজেব রোড, কবি ইকবাল রোড, নুরজাহান রোড, শাহজাহান রোড, রাজিয়া সুলতানা রোড ইত্যাদি। উলেখ্য আধ্যাত্মিক কবি ইকবাল হচ্ছেন পাকিস্তানের জাতীয় কবি এবং রাজিয়া সুলতানা ছিলেন ভারত বর্ষের প্রথম নারী শাসক।
মোহাম্মদপুরে শুধু একটি রোডের নাম মুঘল আমলের ইতিহাস থেকে হয়নি। সেটা হচ্ছে সলিমুল্লাহ রোড। অনেকেই মনে করেন নবাব সলিমুল্লাহর নামানুসারে এই রোডের নামকরণ করা হয়েছে। আসলে এই রোডের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ সলিমুল্লাহ মোহাম্মদের নামানুসারে। শহীদ সলিমুল্লাহ সাহেব ছিলেন খ্যাতিমান সঙ্গীতশিল্পী। তিনি ১৯৭১ সালে ২৩ মার্চ তার নূরজাহান রোডের বাসার ছাদে স্বাধীন বাঙলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন। ২৬ শে মার্চ জুম্মার নামাজ শেষে অবাঙালিরা তাকে মসজিদ থেকে ধাওয়া করে। তারপর ছুড়ি দিয়ে এলোপাথারি কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই রোডের নামকরণ করা হয় সলিমুল্লাহ রোড।
মোহাম্মদপুরে ঢোকার প্রধান সড়কের মাথায় ‘আসাদ গেট’ সাথে এই এলাকার মানুষের সংগ্রামী স্মৃতি জড়িত আছে। ১৯৬৯ সালে অভ্যুত্থানে ১১ দফা দাবী আদায়ে রাজপথে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান। ছাত্রনেতা আসাদকে সেদিন গুলি করা হয়েছিলো চানখারপুল মোড়ে। কিন্তু বিক্ষোভে ফেটে পরে পুরো ঢাকা শহর। এসময় মোহাম্মদপুরের উত্তাল জনতা আইয়ুব খান গেটের নামফলক ভেঙে ফেলে আসাদ গেট নামকরণ করেন।
মোহাম্মদপুরের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা সাত গম্বুজ মসজিদ। ১৬৮০ সালে শায়েস্তা খাঁর আমলে এই মসজিদটি নির্মিত হয়। দূর থেকে শুভ্র মসজিদটি অত্যন্ত সুন্দর দেখায়। একসময় এই মসজিদের পাশে নদীর তীর ছিলো। সেই ঘাটে তখন নৌকা ভিড়ত। বর্ষাকালে নদীর ঘাটে বড় বড় বজরা ভিড়তো সেসময়। পুরান ঢাকার আভিজাত্য পরিবারের সদস্যরা নৌকায় করে সেই মসজিদে নামাজ পড়তে আসতেন। এই নদীর তীর ১৯৮০ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে হারিয়ে গেছে।
এই মসজিদের সাথে আরেকটি রহস্যময় স্থাপনা আছে। মসজিদের পাশে একটি সমাধিসৌধ আছে। সমাধিসৌধে কোনো নামফলক নেই। তবে কথিত আছে, এটি শায়েস্তা খাঁর মেয়ের সমাধি।
মোহাম্মদপুরে মুঘল আমলের নানাবিধ স্থাপনার সাথে সাথে মোগলাই স্বাদের খাবারের জন্য এই এলাকা বিখ্যাত। পূর্বের মত মোগলাই স্বাদের খাবাবের জৌলুসতা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় খাবারে সেই আভিজাত্যের ছাপ এখনও রয়ে গেছে।
ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকা থেকে মোহাম্মদপুর অনেকটা ভিন্ন আমেজের। শহরের অন্যান্য এলাকার মানুষ অনেকটা যান্ত্রিকতা নির্ভর। কিন্তু এই এলাকার মানুষের মাঝে মফস্বল এলাকার একটা আমেজ আছে। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ একে অপরের মাঝে পরস্পর সামাজিকতা বজায় রাখার একটা রীতি আছে। যার ফলে এখনও পুরান ঢাকার মত এখানেও সামাজিক দৃঢ় বন্ধনের আমেজ দেখা যায়।
মোহাম্মদপুর নিয়ে শহরে একটি ভয়ংকর কথা প্রচলিত আছে। সেটা হচ্ছে এই এলাকায় চুরি, ছিনতাই বেশী হয়। প্রচলিত কথাটার ভিত্তি আছে এবং এর পিছনে নির্দিষ্ট কারণও আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই এলাকার অবাঙালির সংখ্যা অত্যাধিক বেড়ে যায়। পুরো মোহাম্মদপুরে প্রায় ২০ লক্ষ বিহারীর বসবাস। এইসব বিহারীদের একসময় কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগই ছিলো না। যার ফলে তারা বাধ্য হয়ে এই ভয়ংকার পেশা বেছে নিতো। যদিও বর্তমানে আইন শৃঙ্খলা তৎপরতার কারণে এই এলাকায় চুরি—ছিনতাই নেই বললেই চলে।
সবশেষে মোহাম্মদপুর নিয়ে একটি ইন্টারেস্টিং স্টোরি শেয়ার করি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের সরকারী কোয়ার্টারে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের পরিবার বসবাসের সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্ত অল্প কয়েক দিন পর গভীর রাতে রক্ষী বাহিনীর একটি সশস্ত্র দল হুমায়ূন পরিবারকে বাড়ি থেকে বের করে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। হুমায়ূন আহমেদের মা আয়েশা ফয়েজ খুব বিপদে পড়ে যান। কারণ ছেলে—মেয়েদের নিয়ে কোথাও থাকার জায়গা তার নেই। দিশেহারা হয়ে তিনি সেই বাসার উঠোনে নারিকেল গাছতলায় বসে পড়েন।
পরের দিন সকালে আহমদ ছফা বাসায় এসে হাজির। আহমদ ছফার হাতে একটি টিন, সেই টিনের কৌটায় পাঁচ লিটার কেরোসিনে ভর্তি, কাঁধে মোটা চাদর। আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে গণভবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে চাইলেন। কারণ তার মতে শহীদ পরিবারকে বাড়ি হতে উচ্ছেদ করে জ্ঞানীর কলমের চেয়েও পবিত্র রক্তকে অবমাননা করা হয়েছে। গভীর রাতে উচ্ছেদ করে দেয়ার মত জঘন্য ঘটনা ঘটাতে পারে সে দেশে আর যাই থাকুক আহমদ ছফা থাকতে রাজি নয়। তিনি উপস্থিত সবাইকে বলেন, এমন ঘৃণ্য দেশে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভাল।
তাই তিনি গণভবনের সামনে নিজের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আত্মহুতি দেবার সংকল্পে উম্মাদ হয়ে উঠেছিলেন। আহমদ ছফার গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহুতি দেয়ার সংবাদ দাবানলের মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই আস্তে আস্তে জড়ো হতে লাগলেন। বন্ধুরা ছফাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্ত ছফা অনঢ়, তিনি আত্মহুতি দেবেনই।
কিছুক্ষণ বাদে কবি বন্ধু সিন্দাকার আবু জাফর ব্যস্ত হয়ে ছফার কাছে এলেন। জোর গলায় বললেন, “আমি ব্যবস্থা করছি। কথা দিচ্ছি, এই শহীদ পরিবারের জন্য থাকার একটা ব্যবস্থা করব। তুমি কেরোসিন টিন আমার বাসায় দিয়ে এসো।”
আহমদ ছফা জবাব দিলেন, “হুমায়ূন পরিবারকে আবার সস্থানে তুলে না দেয়া পর্যন্ত আমি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবো না এবং আপনার হাতে সময় মাত্র ১ ঘন্টা।”
আহমদ ছফার এই পাগলামীতে সরকার এক ঘন্টার মাঝে হুমায়ূন আহমেদের পরিবারকে পুনরায় মোহাম্মদপুরে বাবর রোডে উচ্ছেদকৃত বাসায় তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধতা নিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের এই মোহাম্মদপুর। তাইতো একসময় বলা হতো বাঙলাদেশের রাজধানী ঢাকা, আর ঢাকার রাজধানী মোহাম্মদপুর।

