29.5 C
Chittagong
বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদচট্টগ্রামচট্টগ্রামে একের পর এক ধরা পড়ছে স্বর্ণের চালান

ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা

চট্টগ্রামে একের পর এক ধরা পড়ছে স্বর্ণের চালান

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে স্বর্ণ পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে নানান কৌশলে দুবাই-সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেই একের পর এক আসছে চালান।

বিমানের সিট-টয়লেট, লাগেজ, চার্জার লাইট, জুতাসহ যাত্রীর পেটের ভেতরেও মিলছে স্বর্ণ। বিমান বন্দরে কর্মরত গুটিকয়েক অসাধু কর্মকর্তার যোগ সাজশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অধিকাংশ চালানই চলে যাচ্ছে বিমান বন্দরের বাইরে।

তবে সাম্প্রতিককালে বিমান বন্দরের এন এস আই ও গোয়েন্দা টিম তৎপর রয়েছে। কঠোর নজরদারীতে পুরো বিমান বন্দর। এর ফলও মিলছে। সাম্প্রতিককালে অনেকগুলো স্বর্ণের চালান এখন জব্দের তালিকায়।

তবে অধিকাংশ চালানই ধরা পড়ছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। বরাবরের মতোই অধরা থেকে যায় চোরাচালানে জড়িত মূল হোতারা। হদিস মিলছে না চালানের মূল রিসিভারের। মূলহোতাদের ধরতে না পারার কারণে দিন দিন স্বর্ণ চোরাচালান বাড়ছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

মাঝে মধ্যে দুই একজন বহনকারী যাত্রী ধরা পড়লেও তাদের কাছ থেকে মূল হোতাদের কোন তথ্যই মিলছে না। যারা ধরা পড়ে তারা বাহকমাত্র। এমনকি মূলহোতাকে তারা নিজেরাও চেনেন না। ফলে ভিনদেশে অবস্থানকারী শীর্ষ চোরাকারবারিকে চিহ্নিত করা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কাস্টমসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যে যেসব শ্রমিক কর্মহীন ও অর্থ সংকটে থাকেন তাদেরকে লোভ দেখিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য বহনকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেও মূল হোতাদের বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

সূত্র আরও জানায়, মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ও বাংলাদেশে চোরাচালান চক্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারা বাহককে স্বর্ণ বহনের বিনিময়ে যাতায়াতের টিকিট ও কিছু টাকাসহ চালান বিমানে ওঠার আগে হাতে ধরিয়ে দেন।

এরপর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এলে বিমানের নির্ধারিত স্থানে চালানের প্যাকেটটি রেখে বের হয়ে আসেন বাহক।

পরে সিভিল এভিয়েশন, শুল্ক বিভাগ ও বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় চালান বের করা হয় বিমানবন্দরের বাইরে। এরপর স্বর্ণ সিন্ডিকেটের কমিশন সদস্যদের সহায়তায় ওই চালান চলে যায় নির্ধারিত স্থানে। এরপরও যেসব স্বর্ণের চালান ধরা পড়ে তা ফাঁকি দিয়ে পাচার বা উৎকোচ না দেয়ার কারণেই ধরা পড়ে।

সর্বশেষ শনিবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় একটি স্বর্ণের চালান ধরা পড়ে।

শারজাহ থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের চারটি সিটের নিচে কৌশলে রাখা ৪ কেজি ৫৪০ গ্রাম স্বর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় জব্দ করেছে বিমানবন্দরের এনএসআই ও শুল্ক গোয়েন্দারা।

এয়ারপোর্ট শুল্ক গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের (BG-152) ভেতর থেকে তল্লাশির মাধ্যমে পরিত্যক্ত অবস্থায় সিটের নিচ থেকে এসব স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৭১ হাজার ৩৬০ টাকা।

জানা গেছে, ২০২১-২২ অর্থ বছরে এই বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৮টি অবৈধ চালানে প্রায় ২০ কেজি সোনা আটক করা হয়। যার বাজার মূল্য ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

২০২০-২১ অর্থ বছরে এই বিমানবন্দর দিয়ে ১৮টি অবৈধ চালানে প্রায় ৭৮ কেজি সোনা আটক করা হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৪১ কোটি টাকা এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে চট্টগ্রামে অবৈধভাবে ১১টি চালানে প্রায় ৩৬ কেজি সোনা আটক করা হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

সাম্প্রতিক সময়ে অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম নগরীর হাজারীলেইন ও নিউমার্কেট এলাকার বেশ কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা চট্টগ্রামকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে স্বর্ণ এনে মিয়ানমার ও ভারতে পাচার করছেন।

গত বছরের জুনে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় দায়ের হওয়া স্বর্ণ চোরাচালানের মামলায় চক্রের ২ সদস্য ধরা পড়ে। পরে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর স্বর্ণ চোরাচালানে ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

গত ১৬ জুন কর্ণফুলী উপজেলায় পুলিশ চেকপোস্টে যাত্রীবাহী বাস থেকে সাড়ে ৯ কেজি ওজনের স্বর্ণের চালান জব্দ এবং ২ নারীসহ ৪ জনকে আটক করে পুলিশ।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি বাজুস ২০২২ সালে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন সারাদেশের জল, স্থল ও আকাশপথে চোরাচালানের মাধ্যমে কমপক্ষে ২শ কোটি টাকার অবৈধ স্বর্ণালংকার দেশে আসছে।

দেশে চলমান ডলার সংকটে বিপুল পরিমাণ অর্থের এই পাচার ও চোরাচালান বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার আহবান জানান জুয়েলার্স সংগঠনটি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলামের মতে, সোনা চোরাচালানের নামমাত্র আটক হয়। যারা আটক করবে তারাই সোনা চালানের সঙ্গে জড়িত। সোনা চোরাচালানের বেশির ভাগই আটক হয় না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

চট্টগ্রাম শাহ্ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধভাবে সোনার চালান আসার কথা স্বীকার করে বিমান বন্দরে কর্মরত কাস্টমসের উপ কমিশনার মো. এইচ এম কবির বলেন, এসব চালান বেশির ভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে। বিশেষ করে আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েত থেকে।

বিভিন্ন সময় আটককৃত স্বর্ণের মামলা গুলোর কী অবস্থা জানতে চাইলে কাস্টমসের উপ কমিশনার মো. এইচ এম কবির বলেন, চলমান এবং মামলা গুলো কাস্টমসের পক্ষ থেকে তদারকি করা হয় না।