বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূসম্পত্তি অবৈধভাবে দখল প্রক্রিয়া অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলছে। পুরনো ভুলে এখনও মাশুল গুনে যাচ্ছে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক সংস্থাটি।
দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযানসহ ঠিকাদারি লাইসেন্স বাতিল করেও অজ্ঞাত কালো বিড়ালের থাবায় ভূমির মালিকানা/স্বত্ব অক্ষুন্ন রাখতে বার বারই ব্যর্থ হচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে নানান কুটকৌশল এবং আইনী মারপ্যাচে ফেলে দখলদারত্ব বজায় রেখেছে ভূমি দস্যুরা।
এতইটাই দুঃসাহসিক যে, কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রসাশনের নাকের ডগায় বসেই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আমলা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় রেলের রাজা বনে গেছেন অনেকেই।
তেমনিই একজন এস এ কর্পোরেশন, সিলভার জুবিলী লিমিটেড সহ নানা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলম। যিনি পূর্বাঞ্চল রেলের অসাধু কিছু রেল কর্মকর্তাদের আশির্বাপুষ্ট হয়ে অধিকাংশ নিয়োগ-টেন্ডার-লিজ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। তাছাড়া রেলওয়ের সম্পদ দখলের শতশত অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
গত বছরের ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শাহ আলমের দখল কর্মযজ্ঞ কিছুটা কমে আসলেও সম্প্রতি আবারও মরিয়া হয়ে উঠেছে রেলের সম্পদ দখলে।
চট্টগ্রাম নতুন রেল স্টেশনের কারপার্কিং থেকে শুরু করে নগরীর হালিশহর এলাকায় অবস্থিত রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির (আরটিএ) জলাশয় ও পরিত্যক্ত কোয়ার্টার পুনরায় দখলে নেয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানছেন না উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা কিংবা রেলওয়ের নির্দেশনাও।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৫ সালের ২৫ মে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির আওতাধীন ২৫.৯৭ একরের একটি জলাশয় মাছ চাষের কথা বলে ৫ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছিলেন সিলভার জুবিলী লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলম।
তবে ওই জলাশয়ে মাছচাষ না করে উল্টো সেখান থেকে হাজার হাজার ঘন ফুট বালু উত্তোলন করে জলাশয়ের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র ধ্বংস করার অভিযোগ উঠে।
তাছাড়া জলাশয় থেকে তোলা বালু দিয়ে আশপাশের জায়গা ভরাট করে নিজের জন্য একটি বিলাসবহুল বাংলো বাড়ি তৈরি করে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করা হয়।
পরবর্তীতে সরকারি সম্পত্তিকে বেসরকারি আবাসনে পরিণত করার চেষ্টা হচ্ছে অভিযোগে সিলভার জুবিলী লিমিটেডের লাইসেন্সটি বাতিল করে দেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
এরপর ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর আরটিএ’র পরিত্যক্ত বাংলো নং-০৯, জলাশয়, বাগান ও সন্নিহিত ভূমিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের তৎকালীন ‘ডিইও’ চট্টগ্রামের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই উচ্ছেদ অভিযানে সিলভার জুবিলী লিমিটেডের কাছ থেকে প্রায় ৩.৫০ একর রেলভূমি উদ্ধার করা হয়। পরে রেলওয়ের পক্ষ থেকে ওই এলাকা তারকাটা বেড়া ও দেয়াল নির্মাণের মাধ্যমে সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।
তবে দখলদারিত্বের লোভ যেন সামলাতেই পারছিলেন না শাহ আলম। দখল ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে একটি রিট (পিটিশন নং ৪০১২/১৯) দায়ের করেন সিলভার জুবিলী লিমিটেডের এ স্বত্বাধিকারী।
রেলওয়ের তৎকালীন আইন কর্মকর্তা মো. সালাহ্ উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠির প্রেক্ষিতে জানা যায়, আদালত সিলভার জুবিলী লিমিটেডকে ছয় মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দিলেও ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট শাহ আলম আবারো মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করলে আদালত তা নাকচ করে রেলওয়ের পক্ষে বাদীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তবে আইন-আদালত কিংবা রেলওয়ের নির্দেশনা- কোনো কিছুই পাত্তা দেননি শাহ আলম।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ এক তদন্ত সূত্রে জানা যায়, নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা সত্ত্বেও উচ্ছেদের পর অল্প সময়ের মধ্যেই শাহ আলম তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে ও রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী আরএনবির কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে ওই জলাশয় পুনরায় দখলে নেন। আজও সেখানে রয়েছে তার অটুট বলয়। সূত্র-সি পোস্ট
দীর্ঘদিন রেলওয়ের জলাশয়টি জবরদখল করে রাখায় একদিকে যেমন মোটা অংকের রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকারি সেবামুলক এই সংস্থাটি, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকীর মুখে পড়ছে পরিবেশ।
উচ্ছেদ অভিযানের পরপরই আবার দখলে নেওয়ার ঘটনাকে রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেল কর্তৃপক্ষের দৌড়ঝাঁপ অনেক দেখেছি, এটি নতুন কিছু নয়। “রেল উচ্ছেদ করে, শাহ আলম আবার দখল করে- এটাই এখন বাস্তবতা।”
রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে বলেন, ওই জলাশয় ও কোয়ার্টার পুনর্দখল হওয়ার পর রেলের পক্ষ থেকে আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। উচ্ছেদের পর প্রশাসনিক টিম কয়েকবার গেলেও পরবর্তীতে সবকিছু থেমে যায়।
এ বিষয়ে রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির রেক্টর এস এম সলিমুল্লা বাহার গণমাধ্যমেকে বলেন, রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির (আরটিএ) জলাশয় এবং পরিত্যক্ত কোয়ার্টার লীজ ও দখল এবং আদালতে রিট পিটিশন সম্পর্কে আইন কর্মকর্তার সাথে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে মামলা চলমান আছে,আশা করছি দ্রুতই একটি ফলাফল আসবে।
একই মন্তব্য বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বঞ্চালের আইন কর্মকর্তা আল মাহমুদের। তিনি বলেন,মামলা চলমান। সচিব ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এটনী জেনারেল কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করে জরুরী ভিত্তিতে মামলার শুনানীর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমির জলাশয় এবং রেলওয়ের সম্পত্তি অবৈধ ভাবে দখলে রাখার অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সিলভার জুবিলী লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলশের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। যোগাযোগ করা সম্ভব হলে পরবর্তীতে তার বক্তব্য প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
এদিকে রেলওয়ের সম্পত্তি দখলের একের পর এক অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, রেল কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারেই তারা এই অপকর্ম করছে জানালেও রেল সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্তারা এ বিষয়ে কার্যত পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
তাছাড়া শাহ আলমের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস কারও নেই উল্লেখ করে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, রেলের মধ্যেই শাহ আলমের বিশাল একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। সিন্ডিকেটের ‘লবিং নেটওয়ার্ক’ এতটাই শক্তিশালী যে, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বদলিতেও ভূমিকা রাখে। নিয়ন্ত্রণ রাখেন।
একজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শাহ আলম শুধু ঠিকাদার না, রেলের ভেতরে এক অঘোষিত সম্রাট। সে চাইলেই কর্মকর্তার পদোন্নতি বা বদলি ঠেকিয়ে দিতে পারে। এমন প্রভাবশালী দখলদারকে কেউ ছুঁতেও পারে না।”CSP

