27.5 C
Chittagong
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদলিডপদ্মা অয়েলের পুকুরচুরি ঠেকাবে কে

পদ্মা অয়েলের পুকুরচুরি ঠেকাবে কে

পূর্ববার্তা প্রতিবদেন

পদ্মা অয়েলের এই পুকুরচুরি ঠেকাবে কে। রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকান্ড এখন সরকার এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে বিমেষজ্ঞরা অভিযোগ তুলেছে।
আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও বারবার জ্বালানি চুরির অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের একমাত্র জেট ফুয়েল বিতরণকারী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনা প্রতিষ্ঠানের তদারকি ব্যবস্থা ও পরিচালন দক্ষতার গুরুতর দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

আর্থিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পদ্মা অয়েলের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জেট ফুয়েলের মূল্য বাবদ পাওয়া মার্কিন ডলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে টাকায় রূপান্তর করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের দাবি, এ কারণে সরকার প্রতি বছর ১০০ কোটিরও বেশি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে।এদিকে তদন্তের কার্যকারিতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। কারণ তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার এক মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কমিটি এখনো তাদের প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পদ্মা অয়েলের ডিপোতে সম্প্রতি জেট ফুয়েল চুরির ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

বৈদেশিক মুদ্রা টাকায় রূপান্তর

বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোকে জেট ফুয়েল সরবরাহ করে পদ্মা অয়েল। বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিমানবন্দর ব্যবহারকারী আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলো জেট ফুয়েলের মূল্য মার্কিন ডলারে পরিশোধ করে।

তবে এসব ডলার নির্দিষ্ট ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণ না করে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে টাকায় রূপান্তর করা হচ্ছে।
আর পরে যখন জ্বালানি আমদানির জন্য ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে, তখন আবার বেশি দামেই বৈদেশিক মুদ্রা কিনছে পদ্মা অয়েলের মূল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশি ও বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১,৬০০ টন জেট ফুয়েল ক্রয় করে। গত এক বছরে মোট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন জেট ফুয়েল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রের ওপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, “বিনিময় হারজনিত পার্থক্যের কারণে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলে রাষ্ট্রের প্রায় ২ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। ৩ লাখ ৭৭ হাজার টন জেট ফুয়েল আমদানির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিম মনে করেন, ডলার রূপান্তরের এ প্রক্রিয়া অনিয়মিতভাবে হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়ে থাকতে পারেন। তিনি বলেন, “আর যদি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে করা হয়ে থাকে, তাহলে বিপিসির ক্ষতির বিনিময়ে পদ্মা অয়েল অতিরিক্ত মুনাফা করছে।”

তদন্তে বিলম্ব, প্রশ্নের মুখে তদন্ত কমিটি
পদ্মা অয়েলের ডলার রূপান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত চক্রটি এতটাই প্রভাবশালী যে তারা তদন্ত কার্যক্রমেও বিলম্ব ঘটাতে সক্ষম বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ১৮ এপ্রিল তদন্ত কমিটি গঠন করে জ্বালানি বিভাগ। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ইশরাত রেজা বলেন, বিষয়টির জটিলতার কারণে তদন্ত শেষ করতে বেশি সময় লাগছে।
তিনি বলেন, “আমরা প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র সংগ্রহ করেছি। শিগগিরই অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বসে সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। এরপর দ্রুতই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।”
পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান বলেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণেই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে দেরি হচ্ছে।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর অভিযোগ, কোম্পানির আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা অর্থ ও হিসাব বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কাঞ্চন চন্দ্র সোমের নেতৃত্বে একটি চক্র ডলার বিক্রি করছে এবং পরে আমদানির জন্য বেশি দামে ডলার কিনে মুনাফা করছে।
তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য এড়িয়ে যান কাঞ্চন চন্দ্র সোম। তিনি টিবিএসকে বলেন, “বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিপণন বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের।”
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিম বলেন, এ ঘটনায় কারা জড়িত তা শনাক্ত করতে এত সময় লাগার কথা নয়।
তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনা অনুসন্ধান করা খুব কঠিন কাজ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক সময় অভিযোগ ধামাচাপা দিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, আর বহু ক্ষেত্রে সেই প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখে না।”
ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট খোলায় দীর্ঘসূত্রতা
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ডলারে অর্থ গ্রহণের জন্য পদ্মা অয়েলকে দীর্ঘদিন ধরেই ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট বা বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব খোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে একাধিক নির্দেশনার পর প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি একটি ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্ট চালু করেছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিপিসির পরিচালক (অর্থ) নাজনীন পারভীন এবং মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মুর্শেদ হোসেন আজাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অডিট) জাহাঙ্গীর কবির বলেন, পদ্মা অয়েল ইতোমধ্যে এ ধরনের একটি হিসাব খুলেছে এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, “প্রক্রিয়াটি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।”

তার মতে, বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে ডলারে লেনদেন করাই বেশি বাস্তবসম্মত। তিনি বলেন, “আমরা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে জেট ফুয়েল আমদানি করি। তাই আয়ও যদি ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে ডলার সংকটের সময়ে সেই তহবিল ব্যবহার করা সম্ভব হবে।”

তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করলে বিদেশি ঋণ ও বাণিজ্য অর্থায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ব্যয়সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পেমেন্ট পরিশোধও বিপিসির জন্য সহজ হয়।

জ্বালানি চুরি

গত ১১ মার্চ তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল বহনকারী একটি ট্যাংকার গোদনাইল ডিপো থেকে কুর্মিটোলার উদ্দেশে রওনা দিলেও নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়নি।

ওই ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই ১৮ মে পরিচালিত এক অভিযানে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার একটি বেসরকারি ডিপো থেকে ৯ হাজার লিটার জেট ফুয়েল জব্দ করে কোস্ট গার্ড। ধারণা করা হচ্ছে, এসব জেট ফুয়েল চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের ডিপো থেকে চুরি করা হয়েছিল। একই অভিযানে আরও ৫ হাজার লিটার ডিজেলও উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় ১৯ মে পতেঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সজীব আহমেদ বলেন, চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ চলছে।

তিনি বলেন, “তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে। তবে এ পর্যায়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”

এদিকে, নিখোঁজ ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েলের ঘটনায় গোদনাইল ডিপোর পাঁচ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে কর্মরত বাকি সব কর্মকর্তাকেও অন্যত্র বদলি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান।

তিনি আরও জানান, পতেঙ্গা ডিপো থেকে জ্বালানি উদ্ধারের ঘটনার পর আরও চার কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পদ্মা অয়েলের কর্মকর্তারা জানান, বাজারে প্রতি লিটার প্রায় ২০৫ টাকা মূল্যের জেট ফুয়েল, যা সবচেয়ে দামি পেট্রোলিয়াম পণ্যের একটি, সংগঠিত চক্রের মাধ্যমে প্রকাশ্যে কেনাবেচা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম তামিম বলেন, “জেট ফুয়েল মূলত এক ধরনের কেরোসিন। চুরি হওয়া জ্বালানি উচ্চমূল্যের পণ্য হওয়া সত্ত্বেও তা সাধারণ কেরোসিন হিসেবে বাজারে বিক্রি হয়ে থাকতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনা চুরি প্রতিরোধ এবং আর্থিক কার্যক্রম ব্যবস্থাপনা—উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটির দুর্বলতা ও অদক্ষতা প্রকাশ করছে। টিবিএস