বাংলাদেশ বনাম জঙ্গল সলিমপুর এ যেন এক দেশে দুই শক্তির যুদ্ধ চলছে বিগত দুই যুগ ধরে। সরকার এবং প্রশাসনের উপযুক্ত পদক্ষেপ এবং সঠিক তদারকির অভাবে সঙ্গল সলিমপুরে ঘটে চলেছৈ একের পর এক অবিশ^াস্য ঘটনা। যে সব ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত সাধারণ জনগণ।
জঙ্গল সলিমপুরের অজানা কথা— ১৯৯৭ সালের দিকে সন্ত্রাসী আক্কাসের নেতৃত্বে কয়েকটি পরিবার বর্তমান এশিয়ান উইম্যান ইউনির্ভাসিটি ক্যাম্পাসের বিপরীতে কয়েকটি ঝুপড়ি ঘর করে বসবাস শুরু করে। পরবতীর্তে ২০০০ সালের দিকে বায়েজিদ লিংক রোডের জমি অধিগ্রহন শুরু হলে মানুষের যাতায়াত বেড়ে যায়। তখন সন্ত্রাসী আক্কাস নুরুল হক ভান্ডারীরা বর্তমান জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশ পথে দুই পাহাড়ের মাঝখানের গিরিপথ পার হয়ে পাহাড় কেটে বসতি গড়তে থাকে। জমির পরিমাপ অনুযায়ী ১ থেকে ১০ লক্ষ টাকায় ছোট বড় প্লট করে মানুষকে বসবাসের সুযোগ করে দিতে থাকে। ধীরে ধীরে আক্কাসের বাহিনী বড় হয়ে উঠতে থাকে। ২০০৫ পরবতীর্তে রীতিমতো ব্রোকার নিয়োগ করে শহরের বিভিন্ন স্থানে সন্তায় জঙ্গল সলিমপুরে জমি পাওয়া যায় বলে প্রচার প্রচারনা চালাতে থাকে।
২০০৭—২০০৮ সালের দিকে শুক্রবার শনিবার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্লট ক্রেতাদের রীতিমতো মেলা বসে যেতো। চাহিদা বাড়তে থাকায় পাহাড়ের পর পাহাড় কেটে জঙ্গল সলিমপুর মৌজার ৩১০০ একর এলাকার পাহাড় কেটে প্লট বরাদ্দ দিতে থাকে। নিজের সা¤্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে আক্কাসের নিজস্ব বাহিনী দুই পাহাড়ের মাঝের গিরিপথে তোরন তৈরি করে পুরুষ মহিলা সিকিউরিটি দিয়ে চেক করে প্লট ক্রেতাদের প্রবেশ করানো হতো। ২০০৮ সাল পাহাড় নিধনের বিষয়ে পত্র পত্রিকায় ব্যাপক সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকলে তৎকালীন জেলা প্রশাসন এডিশনাল ডিস্ট্রিক ম্য্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে সীতাকুন্ড এসি ল্যান্ডের সহায়তায় সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দিলে প্রশাসনিক তৎপরতায় র্যাবের হাতে সন্ত্রাসী আক্কাস নিহত হয়।
আক্কাস নিহত হওয়ার পর জঙ্গল সলিমপুর থেকে বাসে ট্রাকে এসে শত শত লোক চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে তিনদিন অবস্থান ধর্মঘট করে। আক্কাস নিহত হওয়ার পর প্রশাসনিক তৎপরতা না থাকায় ইয়াসিন, ফারুক নুরুল হক ভান্ডারী বাহিনী একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে।
কে এই আক্কাস : ডাক নাম ইয়াসিন (৩৮)। তিনি চট্টগ্রাম শহরের অদূরে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল আলী নগর এলাকার বাসিন্দা হলেও জঙ্গল সলিমপুরের জামাই হিসেবে পরিচিত। এলাকার সবাই আদর করে ডাকেন জামাই ইয়াসিন নামে। ২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন মোহাম্মদ ইয়াসিন। সঙ্গে নিয়ে আসেন ছোট ভাই ফারুককে। নিজে যোগ দেন একটি জুট মিলে। টাকার অভাবে বাসা ভাড়া নেন জঙ্গল সলিমপুরে। আর সেখানে গিয়েই অপরাধ জগতের গডফাদার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে সে সময় জঙ্গল সলিমপুরের ত্রাস আলী আক্কাসের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তিনি। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
ইয়াসিন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে সব ধরনের অপরাধীর আশ্রয়—প্রশ্রয় দাতা হয়েছেন। ইয়াসিনের আরেক সহযোগী মো: ফারুকসহ ওই এলাকায় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ছয় সন্ত্রাসী। তাদের সবার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। বিশেষ করে মো: ফারুকের বিরুদ্ধেই রয়েছে ১১ মামলা। এ ছাড়াও জামাই ইয়াসিনের বিরুদ্ধে রয়েছে তিনটি মামলা। নুরুল হক ভাণ্ডারির নামে রয়েছে চারটি মামলা। মো: শাহীনের বিরুদ্ধে রয়েছে তিনটি মামলা, মো: মেজবাহ হোসেন বিপ্লবের বিরুদ্ধে রয়েছে একটি মামলা। সাহেদের বিরুদ্ধে রয়েছে পাঁচটি মামলা। গোয়েন্দাদের ভাষ্য অনেকে ইয়াসিন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলা করতে সাহস পায়নি। রাজনৈতিক খবর অ্যাপ
স্থানীয়দের কাছে জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক ভয়ঙ্ককর জনপদ হিসেবে পরিচিত। পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটি। প্রশাসনের একের পর এক অভিযানে হামলা, সরকারি কর্মকর্তাদের গণপিটুনি, অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্যর সবকিছুকে ছাপিয়ে এবার র্যাবের এক কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে সেখানকার সন্ত্রাসীরা। এই নৃশংস ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও ঘটনার মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, র্যাবের হাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নানও জীবিত থাকাকালে এই জঙ্গল সলিমপুরে আত্মগোপনে ছিলেন। তার সাথে ঢাকার অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীও আশ্রয় নিয়েছেন। ২০১৭, ১৮ ও ২৩ সালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পাহাড় দখল, পাহাড়কাটা, ডাকাতি এবং জাহাজ থেকে তেল চুরির পর সেই তেল চোরাকারবারিদের কাছে বিক্রিসহ সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে দখলবাজি—চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছেন ইয়াসিন।
সর্বশেষ হামলা সম্পর্কে র্যাব— র্যাব জানিয়েছে, হামলায় একে—৪৭—এর মতো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলছে। ইতিমধ্যে বেশ প্রায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনী।
রোববার দিবাগত রাত একটা থেকে দুইটার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম ও র্যাব—৭—এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চলছে। র্যাব জানায়, আগামী ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। যে ক্যাম্পটি সন্ত্রাসীরা গুঁড়িয়ে দিয়েছে, সেটি তারই উদ্বোধন করার কথা ছিল। র্যাব—৭—এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘যাদের অভিযান চালিয়ে এখান থেকে তাড়ানো হয়েছিল, সেই সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপের ২০০ থেকে ৩০০ জন লোক সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায়। তাদের হাতে রামদা, দেশীয় অস্ত্র এবং একে—৪৭—এর মতো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।’
তিনি জানান, হামলাকারীরা এক্সকাভেটর দিয়ে আলীনগর স্কুলে থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের পেছনের দেয়াল ভেঙে দেয়। ওই স্কুলের শেষ প্রান্তে যৌথ বাহিনীর নতুন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি হচ্ছিল। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। এক্সকাভেটর দিয়ে সেটি প্রায় পুরোটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
র্যােবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা ফায়ার (গুলি) করে আমাদের লোকজনকে ব্যস্ত রাখে এবং সেই সুযোগে ভাঙচুর চালায়। ক্যাম্পের পাশের পাহাড়ে থাকা নতুন কয়েকটি টিনের ঘরের ভেতর থেকে টিন ফুটো করে বন্দুকের নল বের করে তারা গুলি ছুড়েছে। আমাদের লোকজন মানবাধিকার সমুন্নত রেখে পাল্টা গুলি চালিয়েছে। এই ঘটনায় আমাদের কেউ হতাহত হয়নি।’
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এসপি মাসুদ আলম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে যাতায়াতের রাস্তার বেশ কয়েকটি অংশ এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো যানবাহন ব্যবহার করতে না পারে এবং দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারে।
তিনি বলেন, ‘আলীনগর স্কুলে র্যাব, পুলিশ, এপিবিএন ও আরআরএফ সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য ছিল, আমাদের ফোর্স যেন সেখান থেকে বের হতে না পারে।’
এসপি আরও বলেন, ‘আমাদের ফোর্স শটগান, চাইনিজ রাইফেল ও গ্যাসগান ব্যবহার করেছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে মোট ১০৪টি গুলি ছোড়া হয়েছে। শক্ত প্রতিরোধের কারণে সন্ত্রাসীরা ক্যাম্পের ভেতর ঢুকতে পারেনি।’
হামলার খবর পেয়ে রাতেই র্যাব, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেয়। র্যাব—৭—এর অধিনায়ক বলেন, ‘ভেতরে আসার সময় আমরা দেখি, বিভিন্ন কালভার্টের সামনে বড় বড় গর্ত করে রাখা হয়েছে। হামলার ঘণ্টাখানেক আগে তারা খুব দ্রুততম সময়ে এই কাজ করেছে। বাধ্য হয়ে আমরা গাড়ি ছাড়াই ভেতরে প্রবেশ করি।’
বর্তমানে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকা যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু আসামিকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’
জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী উত্থান অসহায় প্রশাসন—
সন্ত্রাসী আক্কাস নিহত হওয়ার পর ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সঙ্গল সলিমপুরে উল্লেখযোগ্য উচ্ছেদ অভিযান হয়নি। ২০২২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বে সাড়াশি অভিযান পরিচালনা করে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান করে। কেন্দ্রীয় কারাগার স্থাপনসহ বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা নেয়া হয়। মোমিনুর রহমান বদলি হয়ে যাওয়ার পর রহস্যজনক কারনে জঙ্গল সলিমপুরের মহা পরিকল্পনা স্থবির হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে সেখানে আক্কাসের সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা আলাদা দল তৈরি করেন।
২০২৬ এর জানুয়ারীতে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে র্যাব—৭ এর নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন তিনজন।
২০২৪ এর ৫ আগস্ট দেশের রাজনীতির পটপরিবর্তনের পর এ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ, খুনাখুনির ঘটনা ঘটে চলছে। সম্প্রতি এলাকায় দখল—নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি হয়। এতে একজন নিহত হন। পরদিন সেখানে প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক।
জঙ্গল সলিমপুরে এলাকাটিতে সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে সন্ত্রাসীরা। এলাকায় বাসিন্দাদের প্রবেশের জন্য রয়েছে পরিচয়পত্র। বাসিন্দা ছাড়া বাইরের কেউ এলাকায় ঢুকতে পারেন না। এমনকি পুলিশ, জেলা প্রশাসনের লোকজনও এলাকাটিতে প্রবেশ করতে গিয়ে অনেকবার হামলার শিকার হয়েছেন।
২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল বড়ইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে হামলায় জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।
এ সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর ককটেল, ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও গুলি ছোড়ে। এর আগের বছর ২০২২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি র্যাবের সঙ্গে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের গুলির ঘটনা ঘটেছিল। একই বছরের ২ আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে বাধা দেওয়া হয় জেলা প্রশাসনের লোকজনকে। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আলীনগরে অবৈধ বসতি ভাঙতে যায় প্রশাসন। সেই সময় আলীনগরের সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা করে।

