জ্বালানি সংকটের কারণে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের এ অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে খাতটির টিকে থাকা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে শুরু করেছে।
পোশাক কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কারখানাগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ১০ ঘণ্টা কর্মসময়ের মধ্যে অন্তত ২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত। পোশাক কারখানাগুলোয় জ্বালানির ব্যবহার হয় মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, লোডশেডিংয়ের কারণে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালাতে হয়, যার জন্য প্রয়োজন হয় ডিজেল। দ্বিতীয়ত, গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক না থাকলে ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবস্থায় জেনারেটর চালু করতে হয়, সেখানেও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে।
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে অনেক কারখানায়ই ক্যাপটিভ জেনারেটর চালানো হয়। এজন্য কারখানাগুলোয় বিপুল পরিমাণ ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও এলপিজি ব্যবহৃত হয়। শিল্প—কারখানা চালাতে গ্যাসের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন না থাকায় জেনারেটরে বিকল্প হিসেবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। বর্তমানে সরবরাহ সংকট থাকায় কারখানাগুলো জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত সংস্থান করতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলাকাভেদে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চিত্রে ভিন্নতা আছে। প্রতিদিন মোট কর্মঘণ্টার ২ থেকে ৩ ঘণ্টা ব্যাহত হচ্ছে। মোটাদাগে উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মতো।’
পোশাক শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায়ও উঠে এসেছে। ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে এর প্রভাব এবং মোকাবেলায় কর্মপন্থা নির্ধারণ’ শীর্ষক ওই গোলটেবিলে সংগঠনটির সভাপতি তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদন ব্যয় ২৫—৩০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতি কনটেইনারে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে।’
ডিসিসিআইয়ের আলোচনায় জানানো হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের বছরে বাড়তি খরচ হয় ১ বিলিয়ন ডলার। যদি তেলের দাম ১২০ ডলারের ওপরে ওঠে, তবে জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়বে বছরে ৪—৫ বিলিয়ন ডলার। ফলে সরকারের লোকসান বাড়ার পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালন ব্যয়ও বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে।
জানা গেছে, তৈরি পোশাক খাতের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন) মিলিয়ে মোট সক্রিয় কারখানা সংখ্যা কম—বেশি তিন হাজারের মতো। ২০২৪—২৫ অর্থবছরে এসব কারখানা থেকে বিশ্ববাজারে ৩৯ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পোশাক রফতানি হয়। তবে চলতি ২০২৫—২৬ অর্থবছরে প্রধান বাজারগুলোর চাহিদা হ্রাসে পোশাক রফতানি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি বিদ্যমান জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে রফতানি আরো কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই—মার্চ) বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। রফতানি আয়ের টানা নেতিবাচক প্রবণতায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প। বছরের ব্যবধানে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় বড় ধরনের উদ্বেগের মুখে পড়েছে বস্ত্র ও পোশাক খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন করা ব্যাংকগুলোও। উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানির এ নাজুক পরিস্থিতির মূলে রয়েছে একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কা। ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়াদেশ কমতে শুরু করে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকেন্দ্রিক অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে পোশাক কারখানাগুলোয় প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এর ফলে খাতটিতে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। কয়েক মাস ধরেই রফতানিতে নেতিবাচক ধারা চলছে। এর পেছনে যদিও জ্বালানি সংকট সরাসরি প্রধান কারণ নয়, তবে ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।’
অতীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি উল্লেখ করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা দেখা দিলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় দেশে ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা উৎপাদন ব্যাহত করছে।’
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমেছে ১ দশমিক ১০ শতাংশ। এছাড়া জার্মানিতে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ রফতানি কমেছে।
দেশের শিল্প খাত প্রধানত গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৬ শতাংশ গ্যাসভিত্তিক। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোয় গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ হচ্ছে, যার মধ্যে ৯১ কোটি ঘনফুট যাচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সার উৎপাদনে বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ নেই বললেই চলে, কারখানাগুলোয় দৈনিক ৩২ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে মাত্র সাত কোটি ঘনফুট গ্যাস দেয়া হচ্ছে। আবাসিক, সিএনজি ও চা শিল্পসহ অন্যান্য খাতে সরবরাহ হচ্ছে ১৫৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি খাতের মজুদ অব্যাহতভাবে চাপে রয়েছে। বিশেষ করে কাতার থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দামে জ্বালানিপণ্যটি আমদানি করছে পেট্রোবাংলা। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিতে প্রতিকূলতা থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে তা আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে। এখন পর্যন্ত সরবরাহ সংকট বড় আকারে দেখা না দিলেও ফিলিং স্টেশনগুলোয় দীর্ঘ ভিড় লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে রফতানি খাতের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি আরো চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বণিক বার্তা

