নিজের শৈশবের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বিবিসি বাংলাকে ২৮ বছর বয়সী সুরভী বলেন,
“তখন আমি গ্রামের স্কুলে ক্লাস টু—তে পড়ি। আমাদের বাড়িটা অনেকটা উঠোনঘেরা ‒ চারপাশে কয়েকটি ঘর, একেকটিতে একেক পরিবার। সবাই আত্মীয়। একে অন্যের ঘরে যাওয়া—আসা, খাওয়া—দাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। একদিন দুপুরে আমার এক কাজিন আমাকে তাদের ঘরে ডাকলো। আমিও স্বাভাবিকভাবেই গেলাম। গিয়ে দেখি ঘরে আর কেউ নাই। এরপর সে আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার মুখ চেপে ধরে।” (প্রকৃত নাম নয়)
তিনি বলেন, “আমি তখন চিৎকার করতে পারছিলাম না, কাউকে ডাকতেও পারছিলাম না। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার দেখছিলাম… বড় হয়ে বুঝেছি, এটিকেই বলে যৌন নির্যাতন।”
সুরভীর মতো অভিজ্ঞতার কথা খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে বলেন। তবে শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা বা নির্যাতনের বড় একটি অংশ ঘটে পরিচিত মানুষের হাতেই ‒ যাদের মধ্যে থাকতে পারেন আত্মীয়, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত কেউ।
সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি কন্যাশিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠায় নতুন করে ঘরে—বাইরে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বিশেষ করে মেয়েশিশুরা কতটা নিরাপদ, পরিবারগুলো কীভাবে ঝুঁকি চিনবে এবং সন্তানকে নিরাপদ রাখতে কী ধরনের সচেতনতা জরুরি ‒ এসব প্রশ্ন এখন অনেকের মনে।
মূলত নিকটাত্মীয়ের প্রতি যে বিশ্বাস থাকে, তা ব্যবহার করেই এই ধরনের কাজগুলো করা হয় — বলছেন নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা অধিকার কর্মীরা।
সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকার মিরপুর—১১ নম্বরে একটি ফ্ল্যাটে শিশুটিকে প্রথমে টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। এরপর গলা কেটে হত্যা করা হয়। তার মাথার অংশটি পাওয়া যায় টয়লেটে এবং শরীরের বাকি অংশ উদ্ধার করা হয় খাটের নিচ থেকে।
ঘটনার দিন, গত ১৯শে মে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধ গোপন ও মরদেহ সরিয়ে ফেলার উদ্দেশ্যে আসামি মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু শিশুটির মা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় সে তার পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করতে পারেনি এবং জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর উদ্বেগ ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কারণ যে ফ্ল্যাটে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, সেটি ছিল রামিসাদের পাশের ফ্ল্যাট এবং এই হত্যাকাণ্ডে যাদের নাম উঠে এসেছে, তারা হলেন রামিসাদের প্রতিবেশী। তাই, অনেকেই লিখছেন, শুধু প্রতিবেশী না, আত্মীয়স্বজনকেও যেন শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে অন্ধবিশ্বাস না করা হয়।
অবশ্য, পরিসংখ্যানও তেমনটাই বলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিতদের দ্বারাই শিশুরা যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ১০০টি যৌন নির্যাতনের ঘটনার ৯৩টির ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ভুক্তভোগী শিশুর পরিচিত কেউ থাকে, বলছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আরএআইএনএন। এ প্রতিষ্ঠানটি ধর্ষণ, সহিংসতা নিয়ে কাজ করে থাকে।
এক মেয়ের ওপর পুরুষের নির্যাতনের ফলে সৃষ্টি হওয়া ভয়, যন্ত্রণা ও মানসিক কষ্টকে তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতীকী ছবিতে।ছবির উৎস,এবঃঃু ওসধমবং
ছবির ক্যাপশান,এক মেয়ের ওপর পুরুষের নির্যাতনের ফলে সৃষ্টি হওয়া ভয়, যন্ত্রণা ও মানসিক কষ্টকে তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতীকী ছবিতে
এর মধ্যে পরিবারের সদস্য থাকে ৩৪ শতাংশ আর পরিচিত থাকে ৫৯ শতাংশ।
বাংলাদেশেও তাই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, “শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনকারীরা শিশুর…আত্মীয়, বন্ধু বা বিশ্বস্ত কেউ হয়।”
২০২০ সালে প্রকাশিত ‘চাইল্ড সেক্সুয়াল এবিউজ ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের গবেষণাতেও বলা হয়েছে, দুর্বৃত্তরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর পরিচিত কেউ থাকেন।
রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন কয়েক বছর আগে অপরাধীর আচরণ ও বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ওপর যৌথভাবে একটি গবেষণা করেছেন।
তাতে দেখা গে্ছে, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনায়ই পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা পরিচিত মানুষ জড়িত থাকে; অপরিচিতরা না।
গবেষণাটি বলছে যে যৌন সহিংসতার ঘটনার মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি, ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ছিল শিশু আত্মীয়, আর ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিল পরিচিত কেউ ‒ যেমন প্রতিবেশী, পরিচিত ব্যক্তি বা নিয়মিত বাড়িতে যাতায়াত করা মানুষ।
এদিকে, জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রতি আট জনে একজন নারী ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আর প্রতি বছর যত সংখ্যক শিশু যৌন নির্যাতনের ঘটনা রিপোর্ট হয়, সেখানে ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশই ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরী, বলছে সংস্থাটি।
অধ্যাপক নাসরীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বাচ্চারা কিছু বলতে পারে না বলেই তারা টার্গেট।”
নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ করা অধিকার কর্মীরাও বলছেন, মূলত নিকটাত্মীয়ের প্রতি যে বিশ্বাস থাকে, তা ব্যবহার করেই এই ধরনের কাজগুলো করা হয়। বিবিসি বাংলা

